
গাড়ির জন্য অপেক্ষায় যাত্রিরা
ঈদের ছুটি কাটাতে স্ত্রীকে নিয়ে সিলেটে শ্বশুরবাড়ি যাবেন একটি পোশাক কারখানার কর্মী আশিক চৌধুরী৷ থাকেন নারায়ণগঞ্জের মদনপুরে। সেখান থেকে সাইনবোর্ড এসেছেন বাসের টিকেট কাটতে। তবে, নিয়মিত ভাড়ার তুলনায় ২০০ টাকা বেশি পরিশোধ করতে হয়েছে তাকে। গতকাল শুক্রবার দুপুরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড বাসস্ট্যান্ডে কথা হয় আশিকের সাথে। কারখানায় অর্ধবেলা কাজ শেষে ছুটি পেয়ে রওয়ানা হয়েছেন তিনি।
আশিক বলেন, “হানিফ পরিবহনের দু’টি টিকেট কিনেছি। রেগুলার ভাড়া ৬০০ টাকা হলেও ভাড়া নিছেন ৭০০ টাকা করে। আবার ১০০ টাকা ঈদ-বোনাস হিসেবেও চেয়ে নিয়েছেন কাউন্টারের লোকজন।” ভাড়া বেশি নিলেও তেমন ‘আক্ষেপ’ নেই জানিয়ে এ পোশাক কর্মী বলেন, “নিরাপদে বাড়িতে পৌঁছাতে পারলেই হলো।”
অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করলেন শিমরাইল যাত্রী ছাউনিতে বাসের অপেক্ষায় থাকা কাজল ও আসমা বেগম নামে আরও দুই নারী পোশাক শ্রমিক। আসমা থাকেন নারায়ণগঞ্জের চৌধুরীগাঁও এলাকায়। যাবেন গ্রামের বাড়ি হাজীগঞ্জে। নামবেন হাজীগঞ্জ শহরের পরের স্টপেজে। মা ও শিশু ছেলেকে গত শুক্রবারই পাঠিয়ে দিয়েছেন। ছুটি পেয়ে আজ নিজে রওয়ানা হয়েছেন। আসমা বলেন, “আমার কাছ থেকে ৪০০ টাকা ভাড়া নিছে। কিন্তু গত সপ্তাহে মাকে পাঠিয়েছি ২৮০ টাকা ভাড়ায়। ঈদে সবসময়ই বেশি ভাড়া দিতে হয়। সরকারও এগুলো থামাইতে পারে না।”
যাত্রী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে যাত্রীর চাপ বেড়েছে। যদিও অন্যান্য ঈদের তুলনায় এবার যাত্রীর চাপ কম বলে দাবি করছেন পরিবহনগুলোর কাউন্টারে থাকা টিকেট বিক্রেতারা। তবে, যাত্রীদের অনেকেই বলছেন, যাত্রীর চাপ থাকায় বাসে প্রত্যাশিত আসন মিলছে না। কেননা রাজধানীর প্রধান কাউন্টারগুলো থেকেই লোকজন টিকেট কাটছেন বেশি। ফলে পরের কাউন্টারগুলোতে প্রত্যাশিত আসন পাচ্ছেন না। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়েরও অভিযোগ তাদের।
যদিও অতিরিক্ত ভাড়ার অভিযোগ অস্বীকার করছেন পরিবহনের সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, নিয়মিত ভাড়াই আদায় করছেন না। এমনকি আশানুরূপ যাত্রীও পাচ্ছেন না বলে দাবি তাদের। ব্রাহ্মণবাড়িয়াগামী তিশা পরিবহনের কাউন্টারে থাকা শাহ আলম বলেন, “ভাড়া বাড়ানো হয়নি। বরং ২০ থেকে ৫০ টাকা কমও নিচ্ছি। কারণ, শুক্রবার যাত্রীর যে চাপ হবার কথা তেমন পাচ্ছি না। রাস্তায় গাড়ি বেশি কিন্তু যাত্রী কম৷ ঈদ উপলক্ষে অনেক পরিবহনের বাসই মহাসড়কে নামানো হয়েছে যেগুলো নিয়মিত চলে না।”
সরেজমিনে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সাইনবোর্ড, শিমরাইল, কাঁচপুর এলাকার তিনটি বাসস্ট্যান্ডে চট্টগ্রাম ও সিলেট রুটের যাত্রীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি দেখা গেছে। বাসের সংখ্যাও ছিল চোখে পড়ার মতো। নিয়মিত পরিবহনগুলোর বাইরেও ঈদ উপলক্ষে অতিরিক্ত কিছু পরিবহনের বাসও নেমেছে মহাসড়কে। যাত্রীদের হাকডাকে মুখর ছিল বাসস্ট্যান্ডগুলো।
সাইনবোর্ড এলাকায় মারশা ট্রান্সপোর্ড লিমিটেড নামে পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার এসএ মিজানুর রহমান বলেন, গতকাল (বৃহস্পতিবার) থেকে ঘরমুখো যাত্রীর আনাগোনা বেড়েছে। তবে, এবার ঈদের ছুটি দীর্ঘ হওয়াতে যাত্রীর চাপ খুব একটা বেশি না।
“ছুটি বেশি থাকায় যে যার সুবিধা মতো সময়ে গ্রামে রওয়ানা হইছে। অনেকেই পরিবারের অন্য সদস্যদের আগেই বিভিন্ন মাধ্যমে পাঠিয়ে দিছে। ট্রেনযাত্রা এবার সহজ হওয়ায় অনেকে ওইদিক দিয়া গেছে। তারপরও বাসে যাত্রী যা আছে তাও খারাপ না।” এদিকে, শিমরাইল এলাকায় নোয়াখালীর কোনো বাসে সিট না পাওয়ার কথা জানান জাফর হোসেন। বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে চাকরি করেন তিনি। বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা তার অপর তিন সহকর্মীর বাড়িও নোয়াখালীতে।
“লোকজনের প্রচুর ভিড়, বেশিরভাগ টিকেটই ঢাকা থেকে বেশি বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। এইখানে তিনটা পরিবহনে জিগাইলাম কয়, টিকেট নাই। অপেক্ষা করতেছি দেখি পরের কোনো লাইনের টিকেট পাই কিনা”, বলছিলেন জাফর। এমন সময় তাদের এক সহকর্মী হন্তদন্ত হয়ে এসে জানান, চারটি টিকেট পাওয়া গেছে কিন্তু তাও একেবারে পেছনের আসনে। উপায়ান্তর না পেয়ে ওই বাসেই ওঠার প্রস্তুতি শুরু করে দেন তারা। ঈদ উপলক্ষে যাত্রী ও পরিবহনের চাপ থাকলেও দুপুর দুইটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত দেশের অতিগুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক দু’টিতে তীব্র যানজট দেখা যায়নি। তবে, একলেন থেকে ছয় লেনে উন্নীতের কাজ চলমান থাকা ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে থেমে থেমে চলছিল যানবাহনগুলো।
এ মহাসড়কের কাঁচপুর, তারাব, রূপসী এলাকায় হালকা যানজট দেখা গেলেও তা দীর্ঘমেয়াদী ছিল না। এ পয়েন্টগুলোতে হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি আনসার সদস্যদেরও তৎপরতা দেখা গেছে।
মহাসড়কে যাত্রী ওঠানো-নামানোয় অনিয়ম দেখা গেছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ এ মহাসড়ক দু’টির পাশে স্থায়ী কোনো টার্মিনাল না থাকায় সড়কের উপরেই এলোপাথারিভাবে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠা-নামা করতে দেখা গেছে। এছাড়া, মহাসড়কে ব্যাটারি ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মতো ধীরগতির যানবাহনের অবাধ চলাচলও ছিল। যদিও মহাসড়কে শৃঙ্খলা রাখার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি সাইনবোর্ড ও শিমরাইল স্ট্যান্ডে দেখা যায়নি। তবে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শিমরাইল হাইওয়ে ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক আবু নাঈম সিদ্দিকী জানিয়েছেন, মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে হাইওয়ে পলিশের সদস্যরা মোতায়েন রয়েছেন। ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে তাদের তৎপরতা রয়েছে।